ব্রেকিং

x

আবরার হত্যাকাণ্ড: রক্তক্ষরণ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যথাই মৃত্যুর কারণ ; ডা. সোহেল মাহমুদ,প্রধান ফরেনসিক বিভাগ,ঢামেক

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ


আবরার হত্যাকাণ্ড: রক্তক্ষরণ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যথাই মৃত্যুর কারণ ; ডা. সোহেল মাহমুদ,প্রধান ফরেনসিক বিভাগ,ঢামেক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে।
বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ এ রিপোর্ট ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছেন।

ডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, এখন ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য অপেক্ষা করছি। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া আলামতগুলোর ওপর সিআইডির মতামত পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব চার্জশিট প্রস্তুত করা হবে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এজাহারভুক্ত আসামি তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আহম্মেদ এবং অমিত সাহাকে বৃহস্পতিবার ফের তিনদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপর আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে কারাগারে পাঠানো হয়। রিমান্ড আবেদনের শুনানির সময় অমিত বলেছেন, ‘আমি মিথ্যাভাবে ফেঁসে গেলাম।’

সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার করা আলামতগুলোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য সেগুলো সোমবার সিআইডিতে পাঠায় ডিবি। যেসব আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিডিও ফুটেজ, ভিকটিমের ল্যাপটপ, ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং ভিকটিম ও আসামিদের মোবাইল ফোন। শিগগিরই বিশেষজ্ঞদের মতামত ডিবি কার্যালয়ে পাঠাবে সিআইডি। পরে এসব আলামতের সঙ্গে ডিবি হেফাজতে থাকা অন্য আলামতগুলো একসঙ্গে আদালতে উপস্থাপন করা হবে। অন্যান্য আলামতের মধ্যে আছে- ৫টি ক্রিকেট স্টাম্প, একটি স্টিলের চাপাতি, স্কিপিং রোপ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রভৃতি।

ময়নাতদন্তে কী উল্লেখ করা হয়েছে তা ডিবি কর্মকর্তারা জানাতে না চাইলেও আবরারের ময়নাতদন্তকারী ডা. সোহেল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, আবরার প্রচণ্ড মারধরের শিকার হয়েছেন। এ কারণে তার শরীরের অভ্যন্তরে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাছাড়া মারধরের কারণে ব্যথা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে আবরার সহ্য করতে পারছিলেন না। অতিরিক্ত ব্যথা এবং ইন্টারনাল রক্তক্ষরণেই আবরার মারা গেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবরারকে প্রচণ্ড মারধর করা হলেও তার শরীরের কোনো হাড় ভাঙেনি। তবে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলা-ফোলা জখম ছিল।



জানতে চাইলে সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্তি আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে বলেন, আবরার হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর তদন্ত হচ্ছে। আমি দুই-একদিন হল সিআইডিতে যোগ দিয়েছি। তাই এ সংক্রান্ত সিআইডির কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত এখনই বলতে পারব না। তবে যতটুকু জানি, আগামী মাসের শুরুতেই এ মামলার চার্জশিট দিতে চায় ডিবি। আমাদের মতামতের জন্য যেন চার্জশিট দিতে দেরি না হয়, এ বিষয়টি নিশ্চয়ই খেয়াল রাখা হবে।

সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবের বিশেষ পুলিশ সুপার রুমানা আক্তার বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, গত দুইদিন আমি ছুটিতে ছিলাম। তাই এ নিয়ে কাজ করতে পারিনি। আশা করছি, দ্রুতই বিশেষজ্ঞের মতামতসহ ফরেনসিক রিপোর্ট ডিবির কাছে হস্তান্তর করতে পারব।

৬ অক্টোবর রাতে বুয়েট শেরেবাংলা হলের ২০১১ এবং ২০০৫ নম্বর হলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরারকে। এ ঘটনায় পরদিন ৭ অক্টোবর আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিনসহ ১৯ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এজাহারে থাকা ১৯ আসামির মধ্যে এ পর্যন্ত ১৬ জনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে জিসান, মোর্শেদ এবং এহতেশামুল রাব্বি তানিমকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে নাম আসায় এ পর্যন্ত আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন, ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ওরফে মিজান এবং শামসুল আরেফিন রাফাত। এ পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া ২০ আসামির মধ্যে ছয় আসামি এরই মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে প্রত্যেকেই হত্যার দায় স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। এই ছয়জনসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই মুহূর্তে কারাগারে আছে ১৩ জন। সবশেষ বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে এজাহারভুক্ত আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে।

মাসুদুর রহমান আরও জানান, এ মুহূর্তে ডিবি হেফাজতে ৭ জন আছে। তারা হল নাজমুস সাদাত, মোয়াজ, শামীম বিল্লাহ, মাজেদুল ইসলাম, শামসুল আরেফিন রাফাত, অমিত সাহা ও খোন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আহম্মেদ। এদের মধ্যে অমিত সাহা ও তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আহম্মেদকে বৃহস্পতিবার পুনরায় রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর আগেও তারা রিমান্ডে ছিল। অন্য পাঁচজন আগে থেকেই ডিবির রিমান্ডে আছে। ওই পাঁচজনের মধ্য থেকে নাজমুস সাদাতকে বুধবার ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ড শেষে মোয়াজ ও শামীম বিল্লাহকে শনিবার এবং মাজেদকে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হবে। শামসুল আরেফিন রাফাতকে ১৫ অক্টোবর ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

এদিকে বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে এজাহারভুক্ত দুই আসামি- অমিত সাহা ও খোন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আহম্মেদকে তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সাঈদ। আরেক আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেয়া হয়।
এদিন পাঁচদিনের রিমান্ড শেষে আসামি অমিত ও তোহাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আসামি অমিত সাহার ফের সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আর আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

এতে বলা হয়, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে শিক্ষার্থী আবরারকে শেরেবাংলা হলের তার রুম (নম্বর ১০১১) থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়। ৭ অক্টোবর রাত আড়াইটা পর্যন্ত ওই হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমের ভেতর নিয়ে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে ক্রিকেট স্টাম্প ও লাঠিসোটা এবং রশি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর মারধর করে।

এতে ঘটনাস্থলেই আবরার মারা যান। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে আবরারের মৃতদেহ ফেলে রাখে। পরে কিছু ছাত্র আবরারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তকালে সাক্ষ্যপ্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণে আসামি অমিত সাহার প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতঃপূর্বে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়া আসামিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অমিত সাহার নাম প্রকাশ করেছে।

মামলাটি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এজন্য আসামিকে ব্যাপাক ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত জরুরি। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতার ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে আসামিকে রিমান্ডে নেয়া প্রয়োজন।

এদিন বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে অমিত সাহাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এ সময় হাতকড়া পরা অমিত সাহাকে এজলাসের ডকে রাখা হয়। এর কিছু সময় পর আদালতে বিচারক এলে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর এক ফাঁকে অমিত সাহার সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হয়। অমিত সাহা বলেন, ঘটনার দিন আমি সেখানে ছিলাম না। রাত দেড়টার দিকে খবর পেয়েছি। আমি মিথ্যাভাবে ফেঁসে গেলাম। শুনানির সময় অমিত সাহাকে বেশ কয়েকবার কাঁদতে দেখা যায়।

আদালতে অমিত সাহার পক্ষে আইনজীবী মঞ্জুরুল আলম রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, অমিত সাহা সম্পূর্ণ নির্দোষ। মামলার এজাহারে তার নাম নেই। ভিডিও ফুটেজেও তাকে দেখা যায়নি। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। পূজার ছুটিতে তিনি বাসায় ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে ঘটনাস্থলে অমিত সাহা উপস্থিত ছিলেন না। এ আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড হয়েছে। ফের রিমান্ডে নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহার পক্ষে আইনজীবী আইয়ুব হোসেন জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, আসামি তোহা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। যে কোনো শর্তে আসামির জামিন মঞ্জুর করা হোক। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত উভয় আসামির জামিন নাকচ করে অমিত সাহার তিনদিনের রিমান্ড ও তোহাকে কারাগারে আটক রাখার আদেশ দেন।
৮ অক্টোবর আসামি খোন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীরের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। রিমান্ড শেষে ১৩ অক্টোবর এ আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ১৫ অক্টোবর এ আসামির ফের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। ওইদিন আসামির উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানির জন্য এদিন (বৃহস্পতিবার) ধার্য করেন আদালত। এদিন কারাগার থেকে তাবাখখারুলকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। শুনানি শেষে আদালত এ আসামির তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯

যোগাযোগ২৪.কম |

Development by: webnewsdesign.com