শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২০
Home মতামত আমাদের রিজার্ভ সব রেকর্ড ভেঙে এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে

আমাদের রিজার্ভ সব রেকর্ড ভেঙে এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে

- Advertisement -

একটি ভালো খবর দিয়েই আজকের নিবন্ধ শুরু করি। খবরটি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ-সম্পর্কিত। আমাদের রিজার্ভ সব রেকর্ড ভেঙে এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। ভাবা যায়! স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আমাদের কোনো রিজার্ভ ছিল না।

ছিল ডলারের সংকট। ১০-২০ ডলারের জন্য যেতে হতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। রীতিমতো তদবির করতে হতো। আর এখন? এখন বিদেশ গমন, বিদেশে লেখাপড়া করার জন্য অফুরন্ত ডলার পাওয়া যায়। এমনকি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বিদেশে বিনিয়োগের জন্যও (ক্যাপিট্যাল অ্যাকাউন্ট) ডলার পান। কত বড় উল্লম্ফন।

৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কি আমাদের দরকার আছে? এ নিয়ে নানা মত প্রচলিত। কেউ কেউ রিজার্ভ ভেঙে ঐ টাকা দিয়ে অবকাঠামো গড়ার কথা বলেন। অন্যরা সাবধানী। এমনিতে একটি দেশের আমদানির জন্য তিন মাসের সমপরিমাণ ডলার থাকতে হয়। সেই হিসাবে আমাদের রাখতে হয় ১২ বিলিয়ন ডলার (দৈনিক ইত্তেফাক ৯.১০.২০)।

এই তুলনায় আমাদের রিজার্ভ অফুরন্ত। রিজার্ভ একটি দেশের আর্থিক শক্তির লক্ষণ। রিজার্ভ প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে বিদেশিরা বাংলাদেশের আমদানিকারকদের ঋণপত্র গ্রহণ করে না। গ্রহণের জন্য বিদেশি ব্যাংকের ‘কনফারমেশন’ লাগে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কমে গেলে দেশীয় মুদ্রার মান (আমাদের ক্ষেত্রে টাকা) রক্ষা করা যায় না।

মুদ্রার মানে অবমূল্যায়ন ঘটে। এমন একটা অবস্থায় দৃশ্যতই আমাদের মুদ্রা রিজার্ভ অনেক। তাই বলে কি তা ভাঙিয়ে অন্য কাজে লাগাব? না, এক্ষেত্রে অনেক বাধা। প্রথম বাধাটি আাামাদের ‘কারেন্সি’-সম্পর্কিত। বাজারে যে মুদ্রা বা টাকা চালু আছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে চালু।

সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নামে পাঁচ টাকা ও তিনম্ন পরিমাণের যে মুদ্রা বাজারে চালু তাও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে চালু। বলা দরকার, বাজারে চালু মুদ্রার হিসাব আছে। এগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায় (লায়াবিলিটি)। এসব মুদ্রার বাহককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমপরিমাণ মূল্য ফেরত দিতে বাধ্য। এ মর্মে প্রতিটি নোটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এখন হিসাববিজ্ঞানের ‘ডাবল এন্ট্রি’ নিয়মের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই লায়াবিলিটির বিপরীতে সমপরিমাণ সম্পদ (অ্যাসেট) রাখতে হবে। আগের দিনে তা স্বর্ণে রাখা হতো। এখন তা আর সম্ভব নয়। রাখা হয় কিছুটা স্বর্ণে এবং বেশির ভাগই বৈদেশিক মুদ্রায় ও সরকারি সিকিউরিটিতে। অল্প অল্প থাকে সিলভার, টাকা মুদ্রা এবং অন্যান্য ঋণ ও অগ্রিমে।

২০১৯ সালের জুনেই দেখা যায়—আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ডলার অ্যাসেট’ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার। এই হিসাবে আমাদের হাতে উদ্বৃত্ত বেশ পরিমাণ ডলার থেকে যায়। কিন্তু দৈনন্দিন কাজের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে হাতে প্রচুর ডলার রাখতে হয়।

আমদানির জন্য দরকার মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিদেশি কোম্পানির পুঁজি, লভ্যাংশের প্রত্যাবসন, বিদেশি কর্মীদের রোজগার প্রত্যাবাসন, সরকারি বিদেশি ঋণের টাকা সুদে ও আসলে পরিশোধ ইত্যাদি নিয়মিত লেনদেনের জন্য প্রচুর ডলার দরকার হয়।

এসব কারণে ডলার খরচ করার ক্ষেত্রে বেশ হিসেবি হতে হয়। মুদ্রা রিজার্ভ বাড়ে, কমে। আমাদের ডলার রিজার্ভের মূল উত্স গার্মেন্টস রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। এই দুইয়ের ওঠানামা আছে। বিশেষ করে এই করোনা পরিস্থিতিতে। অতএব, ডলার খরচের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষভাবে সাবধানি থাকে। তবে ইদানীং দুই-চার মাস যাবত্ যে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে তা খুবই সাময়িক।

এই উল্লম্ফনের উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে—রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি। রপ্তানি বৃদ্ধি নয়। আবার বিপরীতে আমদানিতে সংকোচন। যেহেতু শিল্প-কারখানার কাজ শতভাগ চালু হয়নি। তাই কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি এখন কিছুটা কম। এছাড়া তেল আমদানিতেও খরচ কম হচ্ছে। তেলের দাম কম, চাহিদাও কিছুটা কম। চাল আমদানি খুবই কম।

এছাড়া সাধারণ মানুষ এবং মধ্যবিত্তের ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় ভোগ্যপণ্যের আমদানিতে গতি কিছুটা কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে সামান্য যে পরিমাণ ডলার রিজার্ভ হাতে বেশি আছে বলে মনে হচ্ছে, তা খরচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

যেতে পারে মনে করতে হবে। আমি যা বোঝাতে চাইছি তা হচ্ছে আমাদের অর্থনৈতিক স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। শত হোক ২০-২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। দৃশ্যত একটু বেশিই মনে হয়।

তবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল তা মানতে রাজি নন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের ওপর ভরসা রাখতে চান। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি যা বলছে তা মোটামুটি বিভ্রান্তিকর। এডিবি বলছে, ২০-২১ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

এর বিপরীতে বিশ্বব্যাংক বলছে, এ প্রবৃদ্ধির হার হবে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছর গেছে খুবই খারাপ। ঐ বছরের চার মাস কোনো কাজ হয়নি। এতত্সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।

এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ২০২০-২১ অর্থবছরটা গেল অর্থবছর থেকে খারাপ? মোটেই তা মনে হয় না। দেখা যাচ্ছে এডিবির ( এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) পূর্বাভাস মোটামুটি আমাদের কাছাকাছি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়। আমার ধারণা, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রামাফিক অর্জন করতে হলে তিনটি জিনিস জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। প্রথমেই জোর দিতে হবে ভোগব্যয় (কনজামশন এক্সপেন্ডিচার) বাড়ানোর দিকে।

দেখা যাচ্ছে, গত ফেরুয়ারি-মার্চ ও আগস্টের মধ্যে মানুষের রোজগার কমেছে এবং তাদের ভোগ ব্যয়ও কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার’। পরিবারপ্রতি আয় কমেছে ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ। মার্চে একটি পরিবারের (খানা) আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা।

আগস্ট মাসে তা হ্রাস পায় ১৫ হাজার ৪৯২ টাকাতে। এর বিপরীতে পরিবারপিছু খরচও কমেছে। মার্চে পরিবারপিছু ব্যয় ছিল ১৫ হজার ৪০৩ টাকা। আগস্টে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ১১৯ টাকা। এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র। ‘করোনার’ এখন উঠতিকাল।

অতত্রব তা হবেই। তবে এখন আমাদের দায়িত্ব মানুষের ভোগব্যয় বাড়ানো। এটা করতে হলে মানুষের রোজগার বাড়াতে হবে। মানুষের হাতে টাকা দিতে হবে। শুধু রপ্তানিনির্ভরতা আমাদের এ লক্ষ্য পূরণে খুব বেশি কাজে লাগবে না।

ভোগব্যয় বাড়ানোর প্রধান একটি উত্স হলো রেমিট্যান্স। দেশের প্রায় ১ কোটি পরিবার নিয়মিত রেমিট্যান্স পায়। এই রেমিট্যান্সই গ্রামে চাহিদা সৃষ্টি করে।রেমিট্যান্সের টাকা সমভাবে বাজারে যায়। মানুষ কেনাবেচা বেশি বেশি করে। গত কয়েক মাসে নানা কারণে রেমিট্যান্স আশাতীত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির হার কি ধরে রাখা যাবে? ধরে রাখতে হলে রেমিটেন্সে যে বাধাগুলো আছে তা দূর করতে হবে।

একটি দৈনিক রেমিট্যান্সের ওপর একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছেপেছে। এর শেষ পর্বে বলা হয়েছে, ‘অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম ও কূটনৈতিক সংকট’। রেমিট্যান্সে বাধা সৃষ্টি করছে। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, আমাদের বিদ্যমান প্রধান শ্রমবাজারগুলোয় চাহিদা কমেছে।

সৌদি আরব করছে সৌদিকরণ, কাতার করছে কাতারকরণ। এসব ধরে আলোচনা করলে বোঝা যাবে, শ্রমবাজার ভবিষ্যতে বড় চ্যালেন্স ছুড়ে দেবে। এখন থেকেই তাই সাবধান হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয় যে সমস্যাটির সমাধান দরকার তা হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সমস্যা।

একটি খবরে দেখলাম, প্রণোদন প্যাকেজের বাস্তবায়ন হয়েছে বড়দের ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ। আর ছোটদের মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ আমরা সবাই জানি, প্রায় ৪০-৫০ লাখ ছোট ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান করে। এর থেকে ভোগের চাহিদা সৃষ্টি হয়। আবার দেখলাম কৃষিঋণের বিতরণ অবস্থা খুবই খারাপ। আবার কেন্দ্রিয় ব্যাংক বলছে লোকসানি শাখা বন্ধ করতে।

তার মানে কী? ইটনা, মিঠামইন, নিকলি ইত্যাদি দুর্গম অঞ্চলের ব্যাংকশালাও বন্ধ করতে হবে। তাহলে এদের ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা কী হবে? কৃষিকে, গ্রামকে, প্রত্যন্ত আঞ্চলকে অবহেলা করে ভোগব্যয় বাড়ানো যাবে না। অর্থমন্ত্রী মহোদয় আশা করি তা বিবেচনায় রাখবেন। লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্রঃ ইত্তেফাক। সম্পাদনায় ম/হ স ১৩১০/ ৭।

সর্বশেষ

জ্যাকুলিনের ছবিতে ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়

জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ। এই নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ঝকঝকে হাসির মিষ্টি মেয়ের মুখ। এরইমধ্যে তার কিছু ছবিতে ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। জ্যাকুলিন তার...

বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্কে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: সেতুমন্ত্রী

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন,...

আর্মেনিয়া-আজারবাইজান সংঘর্ষ বাড়াচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা

টানা দুবার যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন করেও থামছে না কোন পক্ষই। আরও তীব্র হয়েছে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে চলা যুদ্ধ। প্রায় এক মাস ধরে চলা যুদ্ধে...

আমাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা উচিতঃ রানী মুখার্জি

এবছর একটু ভিন্ন ভাবে কাটছে পূজা। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ নেই, আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খেয়ে বেড়ানোও হবে না এবার। করোনাভাইরাসের কারণে এবছর...