শুক্রবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২০
Home others চলুন মানবিক হই, মানবিকতার সমাজ গড়ি

চলুন মানবিক হই, মানবিকতার সমাজ গড়ি

- Advertisement -

 

টিভিতে সেদিন ‘স্পাইডারম্যান হোম কামিং চলছিলো’। এমনিতেও আমার সুপার হিরোদের ছবি ভালো লাগে। এর উপর যদি জেনেটিক সুপার হিরো স্পাইডারম্যান হয় তবে তো কথাই নেই। বাস্তবে স্পাইডারম্যানের মতো দেয়াল বেয়ে উঠে যাবার ইচ্ছে অনেকেরই থাকে। কিন্তু সবাই পারে না। কারণ সবার থাকে না সুপার পাওয়ার, কিংবা কোন লক্ষ্য অথবা চূড়ান্ত মানবিকতার নিদর্শন।

মামৌদো গাসামা একজন স্পাইডারম্যান। অন্তত ফরাসী দেশের মানুষ তাঁকে এ নামেই চেনে। দিনটা ছিলো শনিবার। গাসামা চষে বেড়াচ্ছিলেন প্যারিসের এ গলি ও গলি। আফ্রিকার পশ্চিম কোণের মালি থেকে প্যারিসে এসেছেন এ যুবক। খুঁজছেন একটা কাজ, একটা চাকরি। সে যাই হোক, আমাদের ঘড়ির হিসেবে তখন বাজে মোটামুটি সকাল ৮.৩০ এর মতো। পথ চলতে চলতে হঠাৎ গাসামা একটা অদ্ভুত জিনিষ খেয়াল করলেন। দেখলেন একটি শিশু ঝুলছে পাঁচ তলার ব্যালকনি থেকে। খুব ই মারাত্নক ভাবে ঝুলে আছে। একটু এদিক সেদিক হলেই নিশ্চিৎ মৃত্যু। একদল পথ চলতি মানুষ তখন নিচে জড়ো হয়েছে বাচ্চাটিকে বাঁচানোর জন্য, করছে নিস্ফল চিৎকার। দমকলেও খবর দেওয়া হয়েছে। তাদের আসতে এখনো ঢের বাকি। এমন সময় গাসামার মাথায় কী যেন খেলে গেলো। হঠাৎ ঐ দেয়াল বেয়েই তর তর করে উঠে গেলেন পাঁচ তলায়। উদ্দেশ্য শিশুটিকে বাঁচানো। গাসামার এই বীরত্বগাঁথা এখন সোস্যাল নেটোয়ার্কের হট টপিক। হাজার হাজার বার শেয়ার হয়ে গেছে এই ভিডিও। গাসামা পরবর্তীতে বলেন, “উদ্ধারের পর শিশুটিকে লিভিং রুমে নিয়ে যাই। আমিও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। আমার হাত-পা কাঁপছিল”। ঘটনার সময় শিশুটির বাবা মা ছিলেন না বাড়ী আর গাসামার ও ছিলো না দেয়াল বেয়ে চলার কোন পূর্বাভিজ্ঞতা। অচেনা এক শিশুকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রাখা। মানবিকতার এ এক চূড়ান্ত নিদর্শন। গাসামা এই বীরত্বের ফল পেয়েছেন সাথে সাথেই। অভিভাসী থেকে হয়ে গেছেন ফ্রান্সের নাগরিক। সেই সাথে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অফার ও পেয়েছেন দমকলে যোগ দেবার।

কর্ম করলে কর্মফল ও ভোগ করতে হবে। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু যখন আমরা আমাদের চারপাশে তাকাই তখন কী খুঁজে পাই কোন গাসামাকে? নিজেকে প্রশ্ন করুন। দুই বাসের দৌরাত্বে হাত গেলো রাজীবের। কদিন আগেই ঘটনাটি খুবই আকর্ষক একটি সংবাদ ছিলো। বাসের দরজার কাছে দাঁড়ানো রাজীবের হাত কেড়ে নিলো প্রতিদ্বন্দী আরেকটি বাস। বাস থেকে নেমে রাজীব খুঁজছিলো তার কাটা হাত। অনেকেই সেই ভিডিও করতে ব্যাস্ত ছিলেন। এরপর কেউ হয়তো এগিয়ে এসেছিলেন রাজীবের জন্য। কিন্তু রাজীবকে আর আমাদের মানবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয় নি। রাজীব চলে গেছেন মানবতার অনেক উপরে। তারপরেও ঘটে গেছে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা। এগুলোর প্রত্যেকটিই যানবাহনের বেপরোয়া প্রতিযোগীতার কারণে হয়েছে। রাজীবের মৃত্যুর জন্য দায়ী স্বজন পরিবহণের বাসটি সেই একই দিনেই নিউমার্কেটের কাছে এক গৃহবধূর মেরুদন্ড ভেঙ্গেছে, জখম সৃষ্টি করেছে এক শিক্ষার্থীর পায়ে। এরকমই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে কারো বাবা মা, কারো স্ন্তান, কারো বা প্রিয়তম স্ত্রী অথবা স্বামী। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষনা ইনিস্টিটিউটের (এ আর আই) এক গবেষনা থেকে দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাবে চলতি বছরে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। গবেষনা সংস্থা ন্যাশনাল কমিটি টু প্রটেক্ট শিপিং, রোডস এন্ড রেলওয়ের ( এন পি এস আর আর) এক গবেষনায় দেখা যায় ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৮২% এবং মৃতের সংখ্যা বেড়েছে ২৫.৫৬%। ২০১৭ সালে দুর্ঘটনার পরিমান ৩ হাজার ৪৭২ টি এবং নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ২৮৪ জন। এই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ৪২৯ টি। যাতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৪৪১ জন। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা এমন  এক বিভিষীকার নাম যার সমাধান এ দেশে কখনোই খোঁজা হয় নি। যে কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে রাজীব, আয়েশা কিংবা হৃদয় নামের কুড়ি বছরের কোন তরুণকে।

সড়ক দুর্ঘনার পাশাপাশি একের পর এক চলছে ধর্ষন। অন্য দিকে মানুষ প্রশ্ন তুলছে নারীর পোষাক নিয়ে, নারীর বাইরে বেরোনোর এখতিয়ার নিয়ে। অনেক দিন আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি কুরান-হাদিস চষে।” মানবতা আজ কোথায় হারিয়ে গেছে। চোখের সমনেই তো দেখতে পাচ্ছি যাকাতের কাপড়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে পদপিষ্ট হয়ে মানুষ মরছে। মানুষ মরছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে। এখন আমাদের সোস্যাল মিডিয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে কমিশনার একরামের মৃত্যুর ভয়াবহ অডিও ক্লিপ। আব্বু বলে আত্মচিৎকার। আমার জামাই কিছু করে নাই বলে একজন স্ত্রীর আহাজারি বার বার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। এই হত্যা কান্ডের বা এই অবস্থার জন্য কী আমাদের কোন দায় নেই? নাকি আমরা বরাবরের মতোই নিজেদের দায়টাকে চাপিয়ে দিতে চাই প্রশাসন আর শাসক দলের উপর।

এখন আমাদের একজন মামৌদো গাসামার দরকার, যিনি ডানে বায়ে না তাকিয়ে ছুটে যাবেন মানুষের জন্য। আমাদের ও গাসামা ছিলো। ভুলে যাবেন না রানা প্লাজার সেই নিদারুণ ট্র্যাজেডির কথা। কয়েকজন সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে ছুটে গিয়েছিলেন ওই সকল আহত মানুষের সেবায়। অনেকেই পরে আর ঘরে ফিরতে পারেন নি। রানা প্লাজার লাশের স্তুপের সাথে নিজেরাও মিশে গেছেন। কেন হারাচ্ছি আমরা আমাদের সাধারণ মানবিক গুনাবলী? সুধীজনেদের অনেক তত্ত্বকথা আছে। এই নিয়ে হয়েছে, হচ্ছে কিংবা হবেও অনেক সেমিনার সিম্পোজিয়াম অথবা তাবড় তাবড় গবেষনা পত্র। চিহ্নিত হবে কিছু কারণ। কিন্তু ভেবে দেখুন শুধু মাত্র আপনার চাওয়া, শুধুমাত্র আপনার ইচ্ছাশক্তিই পারে সব কিছু বদলে দিতে। গাসামার জায়গায় হয়তো সেদিন আমরা কেউ থাকলে ছূটে যেতাম ঐ শিশুটিকে উদ্ধার করতে অথবা হয়তো অন্যদের মতো নিচে দাঁড়িয়ে করতাম নিস্ফল আস্ফলন। নিজেকে প্রশ্ন করুন। ন্যায্যতা, ন্যায় এর পথে পথ চললে আর ধর্মীয় আনুশাসন মেনে চললে মানবতার অভাব হবার কথা নয় আমাদের। তবুও হচ্ছে। কারণ আমরা সাহস করে আমাদের প্রথম পদক্ষেপটা নিতে পারছিনা। আমরা ভাবছি অন্য কেউ শুরু করুক আমিও শুরু করবো। কিন্তু সেই অন্য কেউটা আপনি কেন নয় সে টা কী ভেবে দেখেছেন?

তাই আসুন মানবিক হই। মানবিকতার আলোয় জীবন গড়ি। মাদার টেরেজা, স্বামী বিবেকানন্দ কিংবা হজরত মুহাম্মদ(সাঃ) কে বই এর মাঝে লুকিয়ে না রেখে নিয়ে আসি নিজেদের জীবনে। শপথ নিই হারাবোনা নিজেদের বিবেক বোধকে। চন্ডীদাশের কথার মতোই বলতে চাই, “শোন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”

 

Author : Dolon Champa Dutta

Student of Media studies and journalism

সর্বশেষ

The Correct Way To Write A Research Paper

What's a research paper? It is among the most essential details of the academic program. Even when you essay writing service are already a...

The app is wholly free, even if you will pay for month that is cheap -to- dues to help you to get into more...

Article writing is my favourite kind of authorship, even though I've dabbled inside the rapid story genre a small. 1 writer may tackle a...

যুক্তরাষ্ট্র ফের সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড

মহামারি করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। গত একদিনে প্রাণহানিতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে দেশটি। নতুন করে ২৬শ’ মার্কিনির মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে...

বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার

বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনাভাইরাস আবারও ভয়ঙ্কর হতে শুরু করছে। গত একদিনেও ৮ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ ঝরেছে ভাইরাসটিতে। ফলে মৃতের সংখ্যা ১৪ লাখ ৭৩ হাজার...