ব্রেকিং

x

বেলা বোসের সংখ্যাতত্ত্ব (থ্রিলার)

মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট ২০১৯

-->
বেলা বোসের সংখ্যাতত্ত্ব (থ্রিলার)

 

আজ সকালে একটু দেরি করে ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভেঙেই প্রতিদিনের অভ্যাস মতো ফোন হাতে নিতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ১১৭টা মিসডকল, ৭২টা মেসেজ। সবগুলোই আমার বয়ফ্রেন্ড নামক প্রানীর দেয়া।
ওহ! আপনাদের বলা হয়নি আমি বেলা মানে বেলা বোস।


মনে পরলো,
কাল রাতে ঘুমানোর আগে ঝগড়া হয়েছে আমাদের। যদিও ঝগড়া নতুন কিছু না। মিষ্টি মধুর ঝগড়ায় প্রেম জোরালো হয়। কিন্তু কালকের ব্যাপারটা আর মিষ্টিমধুর ছিল না মোটেও তাই ব্রেকআপ ছাড়া কোনো পথ ছিলো না।

১১৭ মানে ১+১+৭=৯, ৭২ মানে ৭+২=৯, একটু ভাবতেই মনটা প্রচণ্ড বিরক্তিতে ভরে উঠলো।

এতবার ফোন দেয়ার মানে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা, আর সেই চেষ্টা মাঠে মারা গেল আমার ঘুমের কারণে। তাও প্রচেষ্টার ত্রুটি হয়নি। মেসেজগুলোতে তার ভুল স্বীকার করে হাজারবার স্যরি বলা হয়েছে। সেই সাথে আজ দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা!

.

এই ফোন আর মেসেজগুলো সেন্ড করতে ইউজ করা হয়েছে ৬টা ফোন নাম্বার, যার মধ্যে ২টা নাম্বারের শেষে ৯, অন্য ২টা নাম্বারের শেষে ৬, আরেকটার শেষ ৩ ডিজিট ৫২৮=৫+২+৮=১৫=১+৫=৬, আরেকটার শেষ ৪ ডিজিট ২৫৫৩=২+৫+৫+৩=১৫=১+৫=৬!

বুঝতে পারছি আমার মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। বেশ কদিন ধরে প্রচণ্ড খাটুনির ফলে বেশ ধকল গেছে আমার উপর দিয়ে। এ নিয়ে পড়াশোনা করছি বেশ কদিন। চমক হাসানকে দেখে কিছুটা অনুপ্রানিত হয়ে আমি মানুষের জীবনে অংক বা সংখ্যার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে, লাইব্রেরিতেই দিন কেটে যাচ্ছে। এখন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই অংক নিয়ে প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলছি। It’s my stupidity !

বেশ ভালো একটা ঘুম হয়েছে আজ কারন একটা স্লিপিং পীল খেয়েছিলাম। ঝগড়া থেকে যদি ভাল কিছু হয় তাহলে তো ঝগড়াই ভালো। বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আপন মনে হাসছি আর দাঁত ব্রাশ করছি।

আমি ভীষণ বদমেজাজি হিসেবে সুখ্যাতি আছে। কিন্তু সেটা অস্থায়ী কিছুখন পর আর রাগ মনে থাকে না। এখন যেমন গত রাতের রাগের কারণটাই মনে করতে পারছি না।

বেলা ১২টায় ব্রেকফাস্ট করতে বসে ভাবলাম ওকে একটা রিপ্লাই দেয়া দরকার। বা হাতে ফোন নিয়ে বেশ সময় নিয়ে ছোট্ট একটা রিপ্লাই দিলাম মেসেজে। ৬ শব্দের মেসেজ।
‘মিট করবো,আজ বিকেলে,তোমার বাসায়।’

সাথে সাথে ওর মেসেজ, ‘থ্যাংকুউউউ বেইবি, আমার বাসা খালিই আছে,তুমি চলে আসো জান।’

আমি দূরে বসেও চোখ বন্ধ করে ওর উচ্ছ্বসিত মুখ কল্পনা করলাম।

.

আমি গোসল সেরে লম্বা সময় নিয়ে সাজলাম। ঈদের পর প্রথম এইবার আমাদের দেখা, স্পেশালিটি আছে। ওর দেয়া কালো শাড়িটা আজই প্রথম পড়লাম, অনেক যত্ন নিয়ে। তারপর বাসা থেকে বের হলাম সোয়া তিনটায়। আবার ৩:১৫=৩+১+৫=৯! ডিজগাস্টিং!

.

রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। ১৫ মিনিটেই রিক্সা করে চলে এলাম। ওর দেয়া এড্রেস অনুযায়ী বাসা খুঁজে পেতে প্রবলেম হয়নি। কলিং বেল চাপতেই সাথে সাথে দরজা খুলে গেল। মনে হয় ছটফট করা ছেলেটা দরজার পাশেই ওয়েট করছিল।

.

দরজা খুলতেই ওর এক্সপ্রেশন ছিল দেখার মতো। মুখ হা হয়ে গেছে। কালো শাড়ি, কালো চুড়ির সাথে ম্যাচ করে কাোল অর্নামেন্ট, হাতের পার্স আর ব্লো ডাই করা খোলা চুলের সাথে অপরাজিতা – যে কারো কাছে কালো পরীর মতই লাগার কথা। যথেষ্ট সুন্দরি না হলেও মেকআপ করে সেই ঘাটতি মোটেও রাখিনি। সুতরাং সে যে চোখ ফেরাতে পারবে না, সে আমি ভাল করেই জানি।

এ বাসায় আজই প্রথম এসেছি। অবশ্য এর আগেও একদিন দাওয়াত পেয়েছিলাম। ওর জন্মদিনে, ৯ জুন ০৯/০৬, আবার ৯,৬!!! অস্বস্তিকর।

যা হোক সেদিন আসতে রাজি হইনি। আজ আসতে চাইবো, এ কথা ও কল্পনাতেও নিশ্চয়ই ভাবেনি। এজন্যই অবাক হবার মাত্রাটা একটু বেশি।

.

বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। বেশ সাজানো গোছানো,তবে ফাঁকা। যথেষ্ট বড় বাসা,রুমগুলো সাউন্ড কন্ট্রোলড। ওর মিউজিক প্যাশনের কারণে যাতে বাইরের কারো অসুবিধা না হয় তাই এই ব্যবস্থা।

.

ওর বাবা মা ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছে আসতে আরো কিছুদিন বাকি। ও তাই বলেছে। কিন্তু আমি জানি সারাবছর ও এখানে একাই থাকে। ওকে দিনরাতে সঙ্গ দেয় ওর পার্টটাইম প্রেমিকারা। যারা ওর ফাঁদে পা দেয়,সবাই আসে এ ফ্ল্যাটে। নিজেদের ভার্জিনিটি বিসর্জনের চিৎকার কখনো সাউন্ড কন্ট্রোলড রুমের বাইরে যায় না। একেবারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।

৯ মাসের রিলেশন আমাদের। আবার ৯! বোকার মত বেশিই ভালোসেছিলাম। গত ৬ দিন আগেই এই নির্মম নোংরা সত্যটা আমার সামনে চলে এসেছে। ঝগড়াটা পরোক্ষভাবে সে কারণেই। এতকিছুর পরেও আমি বিশ্বাস করিনি কথাটা, ওকে বলিনি কিছুই।

ওর বেডরুমে বসে আছি। পিৎজা হাট থেকে অনলাইন অর্ডারে ডেলিভার করা পিজ্জা আর চিকেন ফ্রাই খাওয়া শেষ হয়েছে। চিকেন ফ্রাই ওর খুব পছন্দের, বলার অপেক্ষা রাখে না। কোক বলে গ্লাসে ঢালা লিকুইড যে মোটেও কোক নয় সে আমি জানি। জেনেও চুমুক দিলাম। কারণ সিংহের গুহায় ঢুকে তার সাথে লাগতে যাওয়া খরগোশের কাজ নয়। দুই বার চুমুক দিতেই মাথা ঘুরতে লাগলো।

এ সুযোগে ও যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে। কপাল থেকে ঘাম মুছে দেবার ছুতোয় চুল সরিয়ে মিষ্টি করে আলতো চুমু এঁকে দিলো আমার কপালে। আমার নেশা ধরে গেলো।

দু হাতে জড়িয়ে ধরে ও ঠোঁট রাখলো আমার ঠোঁটে। আমি কেঁপে উঠলাম। নিজেকে সমর্পণ করলাম ওর হাতে।

মিনিট ৬ পরে আমি প্রথম প্রেমের ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়ালাম। বাথরুমে গিয়ে বেসিনের আয়নায় নিজেকে দেখলাম। নিজেকে সত্যিই অপূর্ব লাগছে। ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক। আসার সময় ন্যাচারাল কালারের গ্লসি জেল লাগিয়েছিলাম। লাল হলো কী করে? ভাবতেই অদ্ভুত লাগছে। রক্তের টেস্ট মন্দ না, ভালোই।

ও বিছানায় শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। ঠোঁটে হাসির আভা ফুটে আছে কি? কী এক কারণে বেশিক্ষণ তাকাতে পারলাম না। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে পার্সটা হাতে নিয়ে ওর রুম থেকে বেরোবার সময় পায়ে ধাক্কা লেগে এলার্ম ক্লকটা একটু দূরে সরে গেলো। ওটা বেডসাইড টেবিলে ছিল। ও যখন এক্সাইটেড ছিল, তখন হাতের ধাক্কায় নিচে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেছে।
বন্ধ ঘড়িতে সন্ধ্যা ৬টা!

.

পরদিন সকালে চা খেতে খেতে পেপারে চোখ বুলাচ্ছিলাম। পেছনের পাতায় ছোট্ট কলামে একটা নিউজ। ‘শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যুবকের মৃত্যু,গভীর রাতে খালি ফ্ল্যাট থেকে লাশ উদ্ধার।’

নিউজটাতে আমার বয়ফ্রেন্ডের নাম। ইংরেজিতে পুরো নাম ১৮ অক্ষরের, ১+৮=৯! আর নিকনেইম ৬ অক্ষরের!

.

মনে করে দেখলাম, গতকালের তারিখ ছিল ১৫ সেপ্টেম্বরৃ২০১৬! ১৫/০৯/২০১৬!

১৫=১+৫=৬, মাঝে ০৯! ২০১৬ এর শেষে ৬, আবার ২০১৬=২+০+১+৬=৯!

.

এইবার আর সংখ্যাতত্ত্ব বিরক্ত লাগছে না, আমার জীবনটা নয়-ছয় করতে চাওয়া মানুষটাকে নিজে শেষ করতে পেরেছি ভেবেই ভালো লাগছে। হাসতে হাসতেই কফির কাপে চুমুক দিলাম। আমার ব্ল্যাক কফি পছন্দ, রক্তের কালচে লাল! আমার এক কাপ কফিতে ৬ চামচ কো কো পাউডার লাগে।

বেলা বোসের সংখ্যাতত্ত্ব
লিখাঃ সানজিদা রিনি
লেখক, কলামিস্ট ও ফটোগ্রাফার

বাংলাদেশ সময়: ৬:৪৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট ২০১৯

যোগাযোগ২৪.কম |


আসামির জবানবন্দিতে আবরার হত্যার বীভৎস বর্ণনা

Development by: webnewsdesign.com