সমাধি হওয়ার ১৯২ ঘন্টার গল্প

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯

সমাধি হওয়ার ১৯২ ঘন্টার গল্প

যোগাযোগ ডেস্কঃ

৮ জুলাই দুপুর। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল তখন। রংপুর সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি বেয়ে নামতেই এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুর রাজ্জাকের। তিনি জরুরি সভা আছে বলে মেয়র মোস্তফার রুমে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ১৫ মিনিটের একটি জরুরি বৈঠক হলো। প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তফার সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা জাতীয় পার্টির জেলা সহ-সভাপতি আজমল হোসেন লেবু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুর রাজ্জাক ও শাফিউল ইসলাম শাফি, মহানগর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসানুজ্জামান নাজিম, জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মুন্সি আব্দুল বারীসহ জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। মোস্তফার কাছে উপরের নেতৃবৃন্দ দাবি জানিয়ে যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য দিলেন। মোস্তফাও একমত পোষণ করে ওই বৈঠকে জরুরি ভিত্তিতে সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সূত্র জানায়, ওইদিন সন্ধা ৬ টার মধ্যে রংপুর বিভাগ, জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দের সম্মতি নিয়ে সেন্ট্রাল রোডস্থ পার্টি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মোস্তফা ঘোষণা দিলেন, প্রকৃতির নির্ধারিত নিয়মে তিনি পৃথিবী থেকে চলে গেলে আমাদের রাজনৈতিক পিতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপি মহোদয়কে তার ওছিয়তকৃত স্থান পল্লী নিবাসেই করতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা ঢাকায় খোলা স্পেসে তাকে সমাহিত করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। আমরা এরশাদের দেয়া জাতীয় তিন নেতার মাজারের পাশে অথবা সংসদ ভবনের পাশে আসাদ গেট এলাকায় মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কবরের পাশে জায়গার জন্য সরকারকে বলেছি। কিন্তু সে ব্যপারে আমাদের কোনো আশ্বাস দেয়া হয়নি। মোহাম্মদপুর কবরস্থানে সেই এলাকার মেয়র মাত্র একটি কবরের জায়গা দেয়ার জন্য রাজি হয়েছেন। এরশাদকে সেখানে সমাহিত করার কোন প্রশ্নই উঠে না। ক্যান্টনমেন্টে এরশাদকে সমাহিত করা হলে আমরা জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা তার কবরও জেয়ারত করতে পারবো না। সে কারণে তার সমাধি রংপুরের মাটিতে তার নিজের গড়া পল্লী নিবাসেই দিতে হবে। অন্য কোথাও আমরা মানবো। অন্য কোথাও দেয়ার চিন্তা করা হলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অনেক গণমাধ্যম উপস্থিত থাকলেও প্রায় অর্ধেক গণমাধ্যমেই খবরটি সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসেনি। রিপোর্টারদের কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়েছে এখনো মারাই যাননি, তাহলে কবরের দাবি নিয়ে কেন আন্দোলন? কিন্তু এক দিন পর গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষও দাবিটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার ও প্রকাশ করতে থাকে। ঢাকা থেকে ১৬ জুলাই সমাধির ব্যপারে সিদ্ধান্তের কথা বলা হলে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। ইতোমধ্যেই দাবিটি রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের গণদাবিতে পরিণত হয়।

সূত্র জানায়, ১৪ জুলাই রোববার সকাল পৌনে ৮ টায় এরশাদ মারা যাওয়ার খবর ব্রেকিং নিউজের চাংকে স্থান পায়। তখনই তাকে রংপুরের ওছিয়তকৃত পল্লী নিবাসে সমাহিত করার দাবি এক দফাতে পরিণত হয়। রোববার সন্ধ্যায় আবারও সংবাদ সম্মেলন করে সিটি মেয়র মোস্তফা ঘোষণা দেন রক্তের বিনিময়ে হলেও স্যারের সমাধি তার ওছিয়তকৃত পল্লীনিবাসে দিতে হবে। সেদিন ঢাকা থেকে আসা মহানগর সেক্রেটারী এসএম ইয়াসিরও উপস্থিত হন সংবাদ সম্মেলনে। দাবি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি লাশ রংপুরে জানাযা ও দাফনের প্রস্তুতিও চলতে থাকে। পরের দিন সোমবার দলীয় কার্যালয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগীয় নেতৃবৃন্দের এক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বসম্মতিক্রমে আবারও এরশাদকে পল্লী নিবাসে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।

সভা শেষে আবারো প্রেস ব্রিফিংয়ে মেয়র মোস্তফা ঘোষণা করেন, বনানী কবরস্থানে সমাধি দেয়ার মাধ্যমে তাকে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অপচেস্টা করা হচ্ছে। তাকে যদি জাতীয় নেতার মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় আমাদের প্রস্তাবিত খোলা স্পেসে সমাধি দেয়া হতো, তাহলে আমাদের কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু যেহেতু তা করা হচ্ছে না, সে কারণে রংপুরেই তাকে সমাহিত করতে হবে। তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেন, এরশাদ বেঁচে থাকতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ সব সময় তাকে শৃঙখলিত করে রেখেছে। মুক্তভাবে তাকে রাজনীতি করতে দেয়া হয় নি। বিভিন্ন সভা সমাবেশে এরশাদ সেটি বলে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষ তার স্বাক্ষি। তার মৃত্যুর পরেও তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। এরশাদের সুসময় ও দুঃসময় রংপুরের মানুষ ঢাল হয়ে তার পাশে থেকেছে। তাকে ভালোবেসেছে। তাকে ৫ বার এমপি নির্বাচিত করে সম্মানিত করেছে। এরশাদের জীবদ্দশায় তার বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্র হয়েছে, রংপুরের মানুষ পিনপতন নিরবতায় নজীরবিহীন আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করছে। তার লাশ রংপুরের পল্লী নিবাসে সমাহিত করার ব্যপারে যদি কোন ষড়যন্ত্র কিংবা বাধা দেয়া হয়, তাহলে আগের মতোই কঠোর প্রতিরোধ আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে আমাদের প্রিয় নেতাকে তার পল্লী নিবাসে সমাহিত করা হবে।

এরপর সোমবার বেলা ৩ টায় পল্লী নিবাস ক্যাম্পাসের ভেতরে গড়া পিতা মকবুল হোসেন মেমোরিয়াল ডায়াবেটিক হাসপাতলের লিচু বাগানের উত্তরপূর্ব পার্শ্বে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সিটি মেয়র মোস্তাফজিুর রহমান মোস্তফার নেতৃত্বে জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দের উপস্থিতে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে নিজ হাতে কবর খনন শুরু করেন।

কবরটি নগরীর দর্শনা মোড় এলাকার জাতীয় পার্টি কর্মী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, কামাল ও সৈয়দ আলী, বিনোদপুরের নয়া মিয়া এবং বালাপাড়া এলাকার জাকির হোসেন ও সবুজ আহমেদ কবরটি পুরোপুরি প্রস্তুত করেন। সোমবার রাত পৌনে ৮ টায় কবর খনন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। রাত সোয়া ১০টায় খননকৃত কবর পরিদর্শন শেষে আবারও মোস্তফা প্রধানমন্ত্রী ও তিনবাহিনী প্রধানের কাছে রংপুরে এরশাদের সমাধি দেয়ার ব্যপারে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী রংপুরের গৃহবধু, তিনি রংপুরের নাড়ির টান বুঝবেন। এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করার ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন। সেনাবাহিনীর প্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর সাথে যেমন এরশাদের আত্মার টান আছে, তার থেকেও বেশি টান আছে রংপুরের মানুষের। তাকে যখন জেলে রেখে ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন তাকে ৫টি আসনে নির্বাচিত করে ভালোবাসা জানিয়েছিল রংপুরের মানুষ। গত নির্বাচনেও তিনি একদিনের জন্য রংপুরে আসেননি। তবুও তাকে রংপুরের মানুষ বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। তার দুঃসময়ে এবং সুসময়ে রংপুরের মানুষ পাশে ছিল এবং তিনিও রংপুরের মানুষের পাশে ছিলেন। এরশাদকে নিয়ে জীবিত অবস্থায় যেমন ষড়যন্ত্র হয়েছে, মৃত্যুর পরও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এরশাদকে পল্লী নিবাসে দাফনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেন। এরশাদের মৃত্যুর পর মুহুর্ত থেকেই দেশের প্রতিটি গণমাধ্যম রংপুরের মানুষের দাবিটিকে ব্যপক ফলাও করে প্রচার করতে থাকে।

এদিকে মঙ্গলবার সকালে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকায় বনানীতে কবরস্থ করার ঘোষণা আসার পর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। তারা মোস্তফার নেতৃত্বে লাশ এলে জীবন দিয়ে হলেও পল্লী নিবাসে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেন। সে কারনেই মঙ্গলবার লাশ কালেক্টরেট মাঠে আসার সাথে সাথেই লাশকে ঘিরে রেখে শুরু হয় বিক্ষোভ। জানাযা নামাজের আগে এনিয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএমকাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার সাথে সরাসরি বিপরীত মুখি অবস্থানে যান মোস্তফা। একপর্যায়ে তিনি জিএম কাদেরের হাত থেকে মাইক নিয়ে রংপুরে সমাহিত করার ঘোষণা দিলে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।

শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হন নি মোস্তফা, তিনি বলেছেন, লাশের সাথে আমি থাকবো। কোনো আঘাত আসলে আমার বুকেই প্রথম আসবে। এই বলে তিনি জানাযা নামাজের পর মহানগর সেক্রেটারী ইয়াসিরকে নিয়ে নিজেই লাশের গাড়িতে উঠেন এবং নিজেই ড্রাইভ করে চেকপোস্ট দিয়ে না গিয়ে সিটি করপোরেশনের সামনে দিয়ে পায়রা চত্বর লালবাগ হয়ে দর্শনায় পল্লী নিবাসে এরশাদের লাশ নিয়ে যান এবং সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দেন। মোস্তফার অনড় অবস্থানের কারনে এরশাদ পত্নী রওশন এরশাদ, ভাই জিএম কাদেরসহ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও লাশ পল্লী নিবাসের পথে থাকাতেই রংপুরে এরশাদকে সমাহিত করার পক্ষে মিডিয়ায় কথা বলেন।

এ প্রসঙ্গে প্রেসিডিয়াম সদস্য , মহানগর সভাপতি ও রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের রাজনৈতিক পিতা এরশাদ স্যারকে শেষ পর্যন্ত রংপুরের পল্লী নিবাসে তার ওছিয়কৃত স্থানে সমাহিত করতে পেরে মহান আল্লাহ তায়ালার শোকর করছি।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে ঢাকায় খোলা স্পেসে আমাদের নেতারা এরশাদকে সমাহিত করার ব্যপারে কোনো জায়গা বরাদ্দ নিতে পারেননি। বনানীতে কবর দেয়া হলে এরশাদের জীবন কর্ম ও দর্শন এবং জাতীয় পার্টি বিলীন হয়ে যেতো। সে কারণে রংপুরের প্রতিটি মানুষ চেয়েছে রংপুরে তাকে সমাহিত করতে। তারা এই দাবিকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমাকে সামনে রেখে আমার ওপর আস্থা রেখেছে। বিগত আটটি দিন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য বিনিদ্র রজনী কেটেছে। অনেকেই নফল নামাজ পড়েছেন, রোজা করেছেন। আমিও সকল ধরণের চেষ্টা করে তাদের দাবি আদায় করে দিতে পেরেছি জন্য আল্লাহর কাছে শোকরিয়া করছি। তিনি বলেন, এই দাবি আদায় করতে গিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা আমাদেরকে চির ঋণ করে রাখলো।

তিনি বলেন, দাবি আদায় করতে গিয়ে যদি আমাকে জীবন দিতে হতো তবুও তা আমি করতাম। আমার সাথে থাকার জন্য উত্তরাঞ্চলবাসীকে ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের কাজ স্যারের সমাধিকে ঘিরে পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে স্যারের দর্শন ও চিন্তা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে দেয়া এবং জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশের একনম্বর প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আমাদের রংপুরবাসীর এখন এই মিশন।

সূত্র জানায়, রংপুরে স্বশরীরে প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তফা এবং ঢাকায় বিভিন্নভাবে এই দাবি আদায়ের জন্য কাজ করেছেন আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য রংপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক এসএমফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর ও মহানগর সেক্রেটারী এসএম ইয়াসির।

বাংলাদেশ সময়: রাত ১:০১ | মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯

যোগাযোগ২৪.কম |

Development by: webnewsdesign.com