ব্রেকিং

x

সাত-সতেরো এ লড়াই অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে…

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০ | ৪:১২ অপরাহ্ণ


সাত-সতেরো এ লড়াই অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে…
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক। প্রতীকী ছবি

এই নিবন্ধটি সবার জন্য নয়। আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা সম্প্রতি শেষ হয়েছে বা অল্পদিনের মধ্যে হতে যাচ্ছে মূলত এমন জনগোষ্ঠীর জন্য। তবে যারা এমন চাকরিতে রয়েছেন যে করোনা-পরবর্তীকালে আর কর্মক্ষেত্রে ফেরার দরকার নাও হতে পারে—দয়া করে তারাও পড়বেন।

একজন কমিউনিকেশন এক্সপার্ট বলেছিলেন, মাথা হলো ছাতার মতো। শুধু খোলা থাকলেই তা থেকে উপকার পাওয়া যায়। বছরের পর বছর বগলে গুঁজে ঘুরলেও ছাতা আপনার কল্যাণ করতে পারে কি?

দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ওই ছাতা খোলাটা ঠিকঠাক শেখায় না! ফলে বড় বড় ডিগ্রি বগলদাবা করে হরহামেশা পুলকিত হই। কিন্তু বিপদকালে তা আমাদের খুব একটা সাহায্য করতে পারে না।

দয়া করে কেউ একটা চাকরি না দেয়া পর্যন্ত নিজেদের ‘প্রতিভা’ প্রদর্শনের স্ব-ক্ষমতা অর্জন হয় না। কিন্তু দিন তো সবসময় একরকম যায় না। ঘরে আগুন লাগলে কুঁড়েদের চ্যাম্পিয়নও বিদ্যুেবগে ছুটে পালায়। আসলে পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনেক সময়ই চলমান ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে। নভেল করোনাভাইরাস (খুব সম্ভবত) আমাদের তেমন পরিস্থিতিতে ফেলতে যাচ্ছে। তাই ছাতাটি (নাহ্, মাথাটি) বুঝি এবার খুলতেই হবে।

আচ্ছা, আপনার নিজেকে কি বেশ বড় মানুষ বলে মনে হয়? খুব সম্ভবত, না। ভাবছেন সবেমাত্র পড়ালেখা শেষ করলাম। এখনো পছন্দের একটা চাকরিতে ঢুকতে পারলাম না। আমার আবার এমন কী বয়স হয়েছে, তাই তো? খুব ভালো।



নিজে যারে বড় বলে সে যে সত্যিকার ‘বড়’ নয়—কবি তা অনেক আগেই বলে গেছেন! এবার বলুন তো, প্রাইমারি স্কুলে আপনার সাথে পড়া যে মেয়েটা নানা কারণে আর হাই স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি, সে এখন কোথায়? যে ছেলেটার সেভেন-এইটের পর বাবার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে আর পড়ালেখাটা হয়ে ওঠেনি, সে? আপনার সেই সহপাঠীর বড় সন্তান এখন কোন ক্লাসে পড়ে জানেন? কষ্ট করে একটু খোঁজ নেবেন। হয়তো হাসিমুখে বলবে, এবারই হাই স্কুলে ভর্তি করলাম! তার মানে কী?

এর মানে হলো, সে বা তারা এখন থেকে এক যুগ আগেই সংসারের হাল ধরেছে। নিজের আয়-রোজগার দিয়ে সংসার চালাচ্ছে। সন্তানদের পড়ালেখা করাচ্ছে। অনেকেই মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যও পালন করছে। আর আপনি? এখনো হয়তো অতিরিক্ত এমবি বা মিনিট কেনার জন্য কিছু টাকা পেতে মাকে বিরক্ত করছেন!

এক মাসের ওপর হলো পরিবারের আয়-রোজগার থেমে গেছে, মুরব্বিদের চোখে-মুখে উত্কণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট, তবুও আপনার চ্যাটিং থামছে না! স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনগুলো আপনাকে বাস্তবতা অনুভব করার ফুরসত দিচ্ছে না। ভাবছেন চিল, হ্যাংওভার, মাস্তি এগুলোই সব; ওসব ছাড়া কি জীবন চলে?

এর জবাব পেতে বেশি দূর যেতে হবে না। একবেলা ফোনটা দূরে সরিয়ে রেখে আপনার মা-বাবার কথা ও কাজগুলো লক্ষ করুন। সন্ধ্যার পর আন্তরিক পরিবেশে তাদের সাথে সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবে, কী হতে যাচ্ছে—সেটা নিয়ে কথা বলুন।

দেখবেন তারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে কঠিন সময়ের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো এতদিন তা আপনাকে দেখতে-শুনতে-উপলব্ধি করতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আপনার উদাসীনতা বা চালচলন তাদের ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ দিচ্ছে না তো?

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল ফুড ক্রাইসিস রিপোর্ট বলছে, করোনা-পরবর্তীকালে ৫৫টি দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেবে। গড়ে ২৬ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ চরম মাত্রায় ক্ষুধার্ত থাকবে। করোনাসৃষ্ট লকডাউনে প্রতিদিন দেশের ক্ষতি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

করোনার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারাবে ১৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ! দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ (শ্রমশক্তি জরিপ, ২০১৬-১৭), প্রতি বছর দেশে পাস করে বের হওয়াদের দুই-তৃতীয়াংশই থাকছে কর্মহীন….এগুলোকে সব বিগ ডেটা মনে হচ্ছে, তাই তো? ভাবছেন, ওসব নিয়ে জাতিসংঘ, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, আমেরিকা-ইউরোপ কিংবা আমাদের সরকার ভাববে।

আমি ছোট মানুষ এসব ভেবেই বা কী করব? কিন্তু খুব শীঘ্রই আপনি ওই বড় সংখ্যাগুলোর অন্তর্ভুক্ত হবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? আপনি বোঝেন বা না বোঝেন, সমস্যা ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। আর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিতে হয় যুদ্ধ শুরুর আগেই। লড়াইয়ে শামিল হবার পরের প্রশ্নটা কিন্তু কেবলই বাঁচা কিংবা মরার!

অভ্যন্তরীণ প্রায় সব ধরনের আয় বন্ধ। ফরেন রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমছে। অথচ বিপুল জনগোষ্ঠীকে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিতে হচ্ছে। আরও কত দিন দিতে হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। ফলে সরকারি নতুন চাকরির চিন্তা সহসা করা ঠিক হবে না।

কারণ এই ধাক্কা কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত কোনো সংস্থাই সেভাবে নতুন কর্মী নিয়োগের কথা ভাববে না। অন্যদিকে বিদেশী বায়ারদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় অধিকাংশ দেশে আমাদের রফতানি পণ্যগুলোর চাহিদা কমবে। তাই সেসব প্রতিষ্ঠানও নতুন রিক্রুটমেন্টের কথা অচিরেই ভাববে না।

দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ফলে তারাও খুব স্বাভাবিকভাবেই হিসাব-নিকাশ মেলানোর আগে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে মাথা ঘামাতে চাইবে না। তাহলে আপনার কল্পনার জগত্জুড়ে থাকা ‘চাকরি’র সম্ভাবনা আগামী কয়েক মাস বা বছর কেমন হবে, বুঝতে পারছেন?

প্রথম থেকে বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছিল, নভেল করোনাভাইরাস তরুণ ও যুবকদের খুব একটা ঘায়েল করতে পারবে না। কিন্তু কয় মাসের মাথায় এসে এটা স্পষ্ট যে তারাই হতে যাচ্ছে করোনার সবচেয়ে বড় ভিকটিম! পড়ালেখা শেষে প্রত্যাশিত চাকরি, ক্যারিয়ারে সমৃদ্ধি, বিয়েশাদি সবকিছুতে বড় একটা ধাক্কা লাগবে। এটা অপ্রত্যাশিত হলেও অস্বাভাবিক নয়।

একবার ভাবুন, আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। অসংখ্য উপন্যাস, নাটক, সিনেমায় আমরা দেখেছি সে সময়ের তরুণ ও যুবকদের কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। আমাদের পরের প্রজন্ম আবার করোনায় বড় এক ধাক্কা খেতে যাচ্ছে। আল্লাহতায়ালা ভালো জানেন, এর শেষটা ঠিক কীভাবে হবে।

আসলে জীবন সবসময়ই পরিচিত পথে হাঁটার সুযোগ দেয় না। কল্পনা করুন, আপনার বড় ভাই লিবিয়া হয়ে ইতালি বর্ডার দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় আছেন। গভীর রাতে দালালরা তাকেসহ আরও কিছু ‘আদম’ নিয়ে স্পিডবোটে রওয়ানা দিল।

কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে ভূমধ্যসাগরের বেশ গভীরে থাকতেই বলল, ‘ওই যে তীর; সাঁতরে চলে যাও!’ কথা শেষ হওয়ার আগেই পিঠে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে পানিতে ফেলে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোটটি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। হিমশীতল জলে, রাতের অন্ধকারে সেই মানুষগুলো সাঁতার কাটছে। অনেকেই ডুবে মারা যায়। আর যারা সীমান্তরক্ষীদের নজরে পড়ে উদ্ধার হয়, অনেক সময় তাদের শরীরে এক টুকরা সুতাও থাকে না!

এভাবেই শুরু হয় তাদের প্রবাসজীবন। না খেয়ে থাকা, পেটে-ভাতে হাড়ভাঙা খাটুনি, নিয়োগকর্তার প্রতারণা এমন অসংখ্য বিষয় হয়ে ওঠে তাদের নিত্যসঙ্গী। নানা বঞ্চনা, দুঃখ-কষ্ট, অত্যাচার নীরবে সহ্য করতে থাকে সুদিনের আশায়। অতীতে হেলায় হারানো (পড়ালেখা, পরিবারের ব্যবসা দেখা প্রভৃতি) সুযোগগুলো কাজে না লাগানোর জন্য নিজের ওপর রাগ হয়।

কিন্তু হাল ছাড়ে না। শেষটা দেখেই ছাড়ব—এই মনোভাব হয় তাদের লড়াইয়ের মূল উপকরণ। মাস কয়েক পর থেকেই দেশে টাকা পাঠাতে থাকে। কিছু টাকা জমিয়ে যত ছোটই হোক নিজে একটা কিছু শুরু করে। বছর দশেকের মধ্যেই সেখানে প্রতিষ্ঠা পায়! সেটা কীভাবে সম্ভব হয়?

এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীতে করণীয়বিষয়ক নির্দেশনা। এই দুর্যোগে আপনি ডুবে মরবেন নাকি এক দশক পরে প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন—তার অনেকটাই নির্ভর করছে আপনার মনোভাব ও চেষ্টার ওপর। এখনো স্টেরিওটাইপড মাইন্ডসেট নিয়ে বসে থাকলে চলবে? ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ আমাদের তরুণদের বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারত। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা কাজের চেয়ে কথা বলেছি বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ কম।

এখন সময় ভূমধ্যসাগরে গভীর রাতে সেই ভাইয়ের মতো সাঁতার কাটার। যতক্ষণ পারা যায় হাত-পা সমানে চালাতে হবে; থামলেই বিপদ। আর আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে: কর্মক্ষম মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক হতাশ হয়ে পড়লে সম্পদ কিন্তু বোঝায় পরিণত হবে। তখন শুধু আর্থিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় করোনার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।

আমাদের শিক্ষা পদ্ধতির বড় সীমাবদ্ধতা হলো—চিন্তা করতে না শেখা। ফলে গত্বাঁধা টার্গেট সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা অগ্রসর হয়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় সবকিছু মা-বাবারা বুক পেতে সহ্য করে। তারা থাকে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।

ধনী দেশগুলোয় বয়স আঠারো হলেই নিজে একটা কিছু করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। রেস্টুরেন্টে কাজ করা, গাড়ি চালানো, সেলসম্যানশিপ, গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া, রাস্তায় ম্যাজিক দেখানো…হেন কাজ নেই, যা তারা করে না।

কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশকে এমন সাহেব বানায় যে ত্রিশ বছর পার হয়ে যায় তবুও ‘চাকরি’ ছাড়া অন্য কাজে হাত লাগাতে পারে না। মর্যাদাহানি হয়! তবে সবাই তেমন নয়। অনেকে কলেজ জীবন থেকেই নিজের আয়-রোজগার দিয়ে পড়ালেখা করে, ছোট ভাইবোনদের সহযোগিতাও করে। তাদের ব্যাপারে ভাবনার কিছু নেই। কারণ সাঁতারের ওপর আবার পানি কী?

তাহলে আসন্ন বিপদ আঁচ করে এখনই যারা সক্রিয় হতে চায়, তাদের করণীয় কী—নিশ্চয়ই মনে সে প্রশ্ন জাগছে। প্রথম কথা হলো: বাস্তবে ফিরতে হবে। নিজের কী যোগ্যতা ও দক্ষতা আছে তা আপনার চেয়ে ভালো এই দুনিয়াতে আর কেউ জানে না। ফলে প্রথমে দেখুন পায়ের নিচে মাটি কতটা শক্ত। ধরেই নিচ্ছি, এখন গ্রামে কিংবা মা-বাবার সাথে বসতবাড়িতে অবস্থান করছেন।

চারপাশে ভালো করে তাকান। জীবনে ‘চাকরিই করতে হবে’—এই চিন্তা আপাতত বাদ দিন। কারণ ২০২০ সালে ওই লাইনে পরিস্থিতি খুব একটা ভালো হবার কারণ নেই। সেক্ষেত্রে সাত-আট মাস একজন যুবকের জন্য মোটেই কম সময় নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনি ভবিষ্যতে যেখানে ঢুকতে চান, সেখানে কর্মরতদেরই অবস্থা ভালো থাকবে না। আর সরকারি চাকরিতে ‘সেরা এক পার্সেন্টের’ মধ্যে ঢোকার সামর্থ্য আছে? না হলে সেটা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার দরকার নেই।

তাছাড়া প্রদীপের নিচের অন্ধকার দিকটা সম্পর্কেও একটু ধারণা থাকা উচিত। আপনার চেনাজানা যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরিবাকরি করেন, বছরে দু-একবার এলাকায় বেড়াতে আসতে দেখে ভাবেন: তারা বুঝি খুব সুখে আছেন।

কিন্তু তারা প্রতিটা দিন কর্মক্ষেত্রে যেভাবে নিষ্পেষিত হন, অন্যের দ্বারা ব্যবহূত হন—তা কল্পনাতীত। চাঁদও তার অসুন্দর, অন্ধকার দিকটা পৃথিবীকে দেখায় না। আর মানুষ তো নিরন্তর মেকি বা কৃত্রিমতায় ভরা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ফলে তারা সাময়িক প্রদর্শন করে যে খুব ভালো আছে। কিন্তু বাস্তবতা মোটেই সেটা নয়। তা বোঝার জন্য একটা দৃশ্য কল্পনা করুন।

আপনি ২৫ হাজার টাকা বেতনে এক এনজিওতে চাকরি পেলেন। পোস্টিং হাতিয়া অথবা পাটগ্রাম। বাসাভাড়া, যাতায়াত, অন্যান্য খরচ হয়তো কোনো রকমে ম্যানেজ করলেন। কিন্তু প্রতিটা দিন, সপ্তাহ, মাসের টার্গেট আপনাকে দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করে ফেলবে।

এই ঘানি টানা একবার শুরু হলে শুধু টিকে থাকার জন্যই নিজের সবটা দেবেন। তারপরও কর্তৃপক্ষের মন পাবেন না। আপনার সন্তানেরা দাদা-দাদি, নানা-নানী তো দূরের কথা, বাবাকেও ঠিকমতো কাছে পাবেন না। রাজধানী শহরে চাকরি শুরু করা ব্যক্তিদের অবস্থাও তথৈবচ। অথচ বাড়িতে থেকে মাসে ৮ হাজার টাকা আয় করলেও তার চেয়ে ভালো মানের জীবনযাপন করা সম্ভব। চাকরি অধিকাংশের জীবনেই এক মরীচিকা, প্রবেশের আগে তা বোঝা যায় না।

তাই এখন প্রথম কাজ হলো, নিজ পরিবারের পাশে দাঁড়ান। আগামী তিন মাসের পরিকল্পনা করুন। কোরবানির ঈদের আগে আপনি কোথাও মুভ করতে পারছেন না। সেটা ধরে নিয়ে মা-বাবার কাজে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন—তা খুঁজে বের করুন।

তারা না চাইলেও সাহায্য করুন। আপনার মতো একজন যুবক সারাদিন ঘরে বসে চ্যাটিং করবে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবে আর বয়স্ক মানুষগুলো সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করবে—তা হয় না। তারা আপত্তি করলেও শুনবেন না, তাদের কাজে হাত লাগান। অন্তত কোরবানির খাসিটা এখনই কিনে লালন-পালন শুরু করুন।

কবুতর পোষাও শুরু করতে পারেন। তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-বিষয়ক টেনশনের অংশীদার হোন। আপনার দায়িত্ব নেয়ার চেষ্টাটা তাদের তৃপ্তি দেবে। আপনার বসতভিটা, পুকুর, বাগান, ফসলি জমি সবগুলোর মধ্যে সম্ভাবনার দিকগুলো খুঁজতে থাকুন। ভাবনাগুলো টুকে রাখুন। ইন্টারনেটে সেগুলো সম্পর্কে আরেকটুু তথ্য জানতে চেষ্টা করুন।

কৃষিকে ভিত্তি ধরে এগোনোর সুবিধা হলো, সেটা প্রায় তৈরি আছে। তাছাড়া আমাদের দেশে কৃষিতে এখনো ব্যাপক ভ্যালু অ্যাডিশনের জায়গা রয়েছে। অর্থাৎ এখন স্বশিক্ষিত মা-বাবা বছরে যে জমি থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন, একজন শিক্ষিত-সচেতন মানুষ তা দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার ক্ষমতা রাখে।

ফলে সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহারে পরিবারের অন্য সদস্যদের মানসিকভাবে হলেও সহযোগিতা করুন। তাতে আর্থিক লাভের চেয়ে আপনার ‘গায়ে হাওয়া লাগিয়ে’ বেড়ানোর প্রবণতা বন্ধ হবে। সেটা আপনার হতাশা কমাবে, অভিভাবকের তৃপ্তির কারণ হবে। এত লেখাপড়া শিখে এসব করব—এই ভাবনা আপাতত বাদ দেন। কারণ আপনার পুঁথিগত বিদ্যা এখন কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারবে না। তাই মাটিতে পা রাখুন, হাওয়ায় ভাসার দিন শেষ।

পাশাপাশি ভাবুন আপনার এলাকায় কী কী ব্যবসা করার সুযোগ আছে। আপনি হয়তো ভাবছেন—সবাই তো অলরেডি দরকারি সব জিনিসের ব্যবসা করছে, তাহলে আমি আবার কী ব্যবসা করতে পারি? মনে রাখবেন, তারা ৫ টাকায় জিনিস কিনে ৬ টাকায় বিক্রি করে। আর আপনি ১ টাকার জিনিস ৬ টাকায় বিক্রি করবেন! না, দিনে-দুপুরে ডাকাতি করতে বলছি না।

বরং আপনার মেধা ও সেবার দাম হবে সেই ৫ টাকা। মানুষ আনন্দচিত্তে আপনাকে সেটা দেবে। মনে রাখবেন, দ্রব্যের কেনাবেচা একজন নিরক্ষর ব্যবসায়ীও করতে পারে। তাই সেখানে খুব বেশি মনোযোগ না দিয়ে ‘সেবা’ অফার করার কথা ভাবুন।

ব্যবসায়ের ধারণা কীভাবে পাবেন? রাস্তাঘাটে চলার সময় খেয়াল করুন: এলাকার মানুষেরা প্রতিনিয়ত কোন ধরনের সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়। অনেক মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, আপনি তার সমাধান অফার করুন। এর জন্য বড় পুঁজি বা অফিস দরকার না-ও হতে পারে। এমন কিছু বিজনেস আইডিয়া নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছা আছে।

যাহোক, আন্তরিকতা ও সততা দিয়ে লেগে থাকলে সেই প্রবাসী ভাইয়ের মতো পাঁচ-সাত বছরেই আপনি একটা ভালো পজিশনে যেতে পারবেন। এতে সবচেয়ে উপকার হবে আপনার পরিবারের। হ্যাঁ, চাকরিজীবীরা ‘পরিবার’ বলতে বোঝেন নিজের বউ-বাচ্চা। কিন্তু এ পথে হাঁটলে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়েই আপনি ভালো থাকতে পারবেন।

যাহোক, আমার এক সহকর্মীর জাপানের এক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে শেষ করব। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি সেখানে যাওয়ার পরে খেয়াল করলেন, তার পাশের রুমে থাকা ছেলেটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে। অর্থাৎ যতটা জোরে পারা যায়, সেভাবে হাঁটতে চেষ্টা করে। তিনি ভাবলেন, বোধহয় ওর বিশেষ তাড়া আছে।

কিন্তু পরে খেয়াল করলেন, স্থানীয় প্রায় সবাই ওভাবে হাঁটছে! তার মনে খটকা লাগল। তাই সেই জাপানি শিক্ষার্থীকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে দ্রুতগতিতে হাঁটো কেন?’ জবাব শুনে তিনি তাজ্জব বনে গেলেন।

সে বলেছিল, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমা ফেলে মার্কিনিরা আমাদের যেটুকু পিছিয়ে দিয়েছে, তা কভার করার জন্যই ওভাবে দ্রুতগতিতে হাঁটি!’ একটা জাতির সমৃদ্ধির জন্য এমন একটা বোধই যথেষ্ট। আমাদেরও তেমন বোধের ক্ষণ দ্বারে উপস্থিত।

এক মুরুব্বি সেদিন কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘বাবারে, এই করোনা দেশটারে অন্তত ৫০ বছর পিছাইয়া দিল।’ যদিও সেটা নিতান্তই অনুমান। তবুও করোনা আমাদের যতটা পিছিয়ে দেবে, তা পূরণে সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে…কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সূত্রঃ বনিক বার্তা। সম্পাদনা র/ভূঁ। ম ২৮০৪/২১

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক। 

বাংলাদেশ সময়: ৪:১২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

যোগাযোগ২৪.কম |

আসামির জবানবন্দিতে আবরার হত্যার বীভৎস বর্ণনা

Development by: Jogajog Media Inc.

বাংলা বাংলা English English