ব্রেকিং

x

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের নারী-কিশোরীরা

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ | ১২:৪৪ অপরাহ্ণ


স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের নারী-কিশোরীরা
ছবিঃ সংগৃহীত

মহামারি করোনাভাইরাসে প্রতিদিন আক্রমণের সংখ্যা বড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিলও। এ পরিস্থিতিতে বাল্য বিয়ে, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, গর্ভপাতসহ বিভিন্ন প্রকার ঘটনা ঘটছে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য। এদিকে গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব ও পরবর্তী সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে নারী ও কিশোরীরা। কারণ, দেশের ১২ ভাগ নারী-কিশোরী এখনো তাদের স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেনি।

অ্যাডভান্স ফ্যামিলি প্ল্যানিং (এএফপি) মিডিয়া অ্যাডভোকেসির টিমলিডার পুলক রাহা জানান, করোনা মহামারিতে গ্রাম ও শহর সব জায়গার মানুষ বলতে গেলে ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলছে গোপনে বাল্যবিয়ের আয়োজন। করোনাকালীন আর্থিক সংকটের কারণে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের কিশোরী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় বন্ধ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত সেবা না দেওয়ার কারণে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিশ্বের ৪০ লাখ কন্যাশিশুকে বাল্যবিয়ের ঝুঁঁকিতে ফেলেছে করোনা মহামারি। স্কুল বন্ধ থাকা, দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়াসহ করোনা সম্পর্কিত নানা কারণে বাল্যবিয়ের ঝুঁঁকির মুখে পড়েছে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক কন্যাশিশু। বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে বাল্যবিয়ের হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, সংঘাত, দুর্যোগ কিংবা মহামারির সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ে। বাংলাদেশে ২০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, করোনার কারণে আরও ২০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। বাল্যবিয়ের ঝুঁঁকি এসব পরিবারেই বেশি।

কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি নাসিমা আক্তার জলি বলেন, বাল্যবিয়ে রোধে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অসহায় পরিবারের অবস্থা ফেরানোও জরুরি। এসব পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির টাকা বাড়ানো এবং তা যথাসময়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধে আইন প্রয়োগের দিকেও নজর দিতে হবে।



বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব : বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাল্যবিয়ের হার ছিল ৫৯%। কিশোরী মায়ের গর্ভধারণের হার ছিল ২৮%। যা ২০১৪ সালে ছিল ৩১%। কিন্তু এই করোনাকালে এ সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে জনসংখ্যার ওপরও একটি চাপ সৃষ্টি হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো নিয়মিত সেবা না দেওয়ার কারণে কিশোরীরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে। পাশাপাশি বাল্যবিয়ের কারণে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এবং বাড়িতে ডেলিভারি করতে গিয়ে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে : বিডিএইচএসের ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫২ শতাংশ নারী পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ২০১৪ সালে পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৫৪%, এ ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমেছে। প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৪ জন নারী প্রথম বছর পদ্ধতি ব্যবহারের পর পরবর্তীতে পদ্ধতি ব্যবহারে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩০%। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭%।

করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলো সীমিত আকারে স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু রেখেছে এবং অধিকাংশ মানুষ ঘরে থাকার কারণে ও হাতের কাছে পরিবার পরিকল্পনার সেবা না পাওয়ায় এই পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে ঘরে থাকা অনেক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করতে বাধ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে করোনার কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে আগামী দিনগুলোতে শিশু ও মাতৃমৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এই দেশগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা সেবার প্রায় ১০% কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমবে এবং অনিরাপদ গর্ভপাত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের করোনাবিষয়ক পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির এক সভায় জানানো হয়, ২০১৯ সালে মার্চে প্রসবপূর্ব সেবা পাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৫২৬ জন। আর চলতি বছরের মার্চে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৪১৫ জন। এপ্রিলে এই অবস্থা ভয়াবহ হয়। অথচ গত বছরের এপ্রিলে প্রসবপূর্ব সেবা নেয় ৪২ হাজার ৫৭১ জন। চলতি বছরের এপ্রিলে সেবা পেয়েছে মাত্র ১৮ হাজার ৬২ জন। প্রতিষ্ঠানিক প্রসব কমে যাওয়ায় মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সেবা পাচ্ছে না এবং একই সঙ্গে প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে পরিবার পরিকল্পনা সেবা খাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মেরিস্টোপ বাংলাদেশের অ্যাডভান্স ফ্যামিলি প্ল্যানিং কার্যক্রমের সমন্বয়কারী মনজুন নাহার সমকালকে বলেন, করোনাকালীন এবং করোনা-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করতে হলে এই বাজেট কতটা সহায়ক হবে তা এখনই ভেবে দেখা দরকার। পাশাপাশি বাজেটের সাঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করা দরকার।

তিনি জানান, স্থানীয় সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। পরিবার পরিকল্পনার পলিসিতে এ বিষয়ে কৌশলগত পরিবর্তন করতে না পারলে টিএফআর ২.৩ থেকে ২.০০-তে আনার পরিকল্পনা, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা, অপূরণীয় চাহিদা ১২ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা এবং বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। উপরন্তু করোনা মহামারির সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে চাপ তৈরি হবে তা সামলানো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করবে। তাই পরিবার পরিকল্পনা সেবা খাতকে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা খাতের মতো সমভাবে বিবেচনা করে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস : ‘কভিড-১৯-কে প্রতিরোধ করি- নারী ও কিশোরীর সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি’ স্লোগানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশ অগ্রগতি হলেও এই করোনাকালে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ নারী ও কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সকাল ১১টায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিট এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান। অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ পরিবার পরিকল্পনা কর্মী ও শ্রেষ্ঠ সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও মিডিয়া ফেলোশিপ ২০২০ দেওয়া হবে। সূত্রঃ সমকাল। সম্পাদনা ম/হ। ১৪০৭/০৪

বাংলাদেশ সময়: ১২:৪৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০

যোগাযোগ২৪.কম |

আসামির জবানবন্দিতে আবরার হত্যার বীভৎস বর্ণনা

Development by: Jogajog Media Inc.

বাংলা বাংলা English English