ব্রেকিং

x

মাদরাসা অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের ফাঁসি

শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯ | ৮:৩৯ AM


মাদরাসা অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের ফাঁসি
হত্যার আদেশদাতা নুসরাতের মাদরাসার সেই অধ্যক্ষ সিরাজ। ফাঁসির দণ্ডাদেশ শোনার পর আদালত প্রাঙ্গণে। ছবি :সংগৃহীত

অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সারা দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দেওয়া এ হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে ছয় মাস পর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেন।

রায়ে আদালত বলেছেন, নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের তেজোদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে এরই মধ্যে অমরত্ব দিয়েছে।



মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এ ১৬ আসামির মধ্যে রয়েছেন নুসরাতের শিক্ষক সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা (বরখাস্তকৃত), যিনি এই হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতা। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন মাদরাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন এবং সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, যাঁরা হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিক সহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। নুসরাতের তিন সহপাঠী কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ও জাবেদ হোসেন, যারা একই সঙ্গে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিল; নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর যারা আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পরীক্ষার হলে বসেছিল। শিক্ষার্থী ও সিরাজের সহযোগী নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মো. জোবায়ের, হাফেজ আব্দুল কাদের, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, আব্দুল রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মো. শামীম ও মো. মহিউদ্দিন শাকিল।

সকাল পৌনে ১১টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামলার ১৬ আসামিকে আদালতে আনা হয়। সকাল সোয়া ১১টা ৭ মিনিটে বিচারক জনাকীর্ণ আদালতের এজলাসে এসে বসেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন।

রায় পড়তে সময় লাগে ১২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড। রায়ে ১৬ আসামিকেই দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। রায় পড়ার শুরুতেই নুসরাত জাহান হত্যা মামলায় গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন আদালত। আদালত বলেন, গণমাধ্যমের কারণেই এ ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশবাসী জানতে পারে।
নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য আদালত তখনকার সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে তিরস্কার করেন। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে রয়েছেন।

রায় ঘোষণার আগে বিচারক বলেন, মামলার সব আলামত, প্রমাণাদি, ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, তথ্য-উপাত্ত, নানা বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন, যুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে মর্মে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
রায় শোনার পর আসামিরা চিত্কার-চেঁচামেচি শুরু করেন। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ জানান উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তাঁরা। আসামিরা এ সময় বাদীপক্ষের আইনজীবীদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন।

রায় ঘোষণার পর বিচারক খাসকামরায় চলে যান। এরপর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হাফেজ আহাম্মদ বিচারকের পক্ষে সরবরাহ করা রায়ের সারমর্মের একটি লিখিত কপি সাংবাদিকদের দেন।

১৭৩ পৃষ্ঠার রায়ের সারাংশে বিচারক বলেন, নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের এই তেজোদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে অমরত্ব দিয়েছে। তার এ অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা।
বিচারক বলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ডিগ্রি মাদরাসা ফেনীর অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়নরত।
এখানকার শিক্ষা বিস্তারে এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই কালিমালিপ্তকারী ঘটনায় বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি আসামিদের ঔদ্ধত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়ই। এ কারণে দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৪(১)/৩০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেছেন আদালত। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দণ্ডাদেশ কার্যকর করতে এবং জরিমানার অর্থ আদায় করে নুসরাতের মা-বাবাকে দিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে।

এরপর দ্রুত প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের আবার ফেনী কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে তার মায়ের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতকে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবন-কাম-সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ও মুখ চেপে ধরে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানে নুসরাত। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এর আগে ৮ এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা করেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ৩৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে গত ২৯ মে ১৬ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে তদন্তকারী সংস্থা।

গত ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ২৭ জুন থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। মামলার ৯১ সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন সাক্ষ্য দেন। অন্য চারজনের মধ্যে একজন বিদেশে থাকায় এবং তিনজনের সাক্ষ্য অন্য সাক্ষীদের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়ায় তাঁদের সাক্ষ্যগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। আলোচিত এ হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মাত্র ৬১ কার্যদিবসে, যা নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন ফেনী বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার রায় ঘোষণার জন্য ২৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। সে অনুযায়ী আদালত গতকাল রায় ঘোষণা করেন।

এ সময় এজলাসে মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা মানিক, ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনী পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম, আসামি, রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উচ্চ আদালতে যেন এ রায় কার্যকর থাকে, তেমন প্রস্তুতি নেবেন তাঁরা।

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩৯ AM | শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

যোগাযোগ২৪.কম |

ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘে ভোট; আমেরিকা-ইসরায়েলের বিপক্ষে কানাডা
কাওরানবাজারে ৮০ টাকায় নতুন পেঁয়াজ
নির্যাতনের শিকার সেই সুমি সৌদি পুলিশের হেফাজতে

Development by: webnewsdesign.com