জ্বালানি তেলে লাভ করেও দাম বৃদ্ধির তোড়জোড়

এগারোশ কোটি টাকা লোকসানের হিসাব দেখিয়ে গত ৩ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। ফলে বেড়ে যায় পরিবহন ব্যয়।

 প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামে। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এক হাজার ২৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছে বিপিসি। বিপিসি দাবি করেছে, বিশ্ববাজারের চেয়ে কম দামে ডিজেল বিক্রির কারণে প্রতিদিন শতকোটি টাকার ওপরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এজন্য দাম বাড়াতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ধরনা দিচ্ছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার জন্য দেশে জ্বালানি তেলের বিক্রিতে বিপিসির কিছু সময় লোকসান হতেই পারে; কিন্তু তারা তো গত কয়েক বছর ধরে লাভ করেছে। সেই অর্থ কোথায় গেল? কারণ এই অস্থিতিশীলতা সাময়িক। সংকটকালে লাভের হিস্যা থেকেই ঘাটতি পূরণ করা যায়। বর্তমানে দ্রব্যমূল্য অসহনীয় পর্যায়ে। এ অবস্থায় তেলের দাম বাড়ানো সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। প্রতিদিনের লোকসানের যে হিসাব বিপিসি দেয়, তাতেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। লোকসানের কথা বললেও থেমে নেই সংস্থাটির অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক ভবন নির্মাণ করছে বিপিসি।

মুনাফায় বিপিসি :২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ক্রমাগতভাবে মুনাফা করছে বিপিসি। গত আট বছরে (২০১৪-১৫ থেকে ২০২১-২২) ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের পরও বিপিসি নিট মুনাফা করে ৪৮ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এই হিসাব গত ৯ জুন বাজেটের পরিবেশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা (২০২২) বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

বিপিসির যুক্তি :সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে প্রতিদিন কমবেশি ১১০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ৮০ ডলারের মধ্যে থাকলে লোকসান হয় না। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম ১২০ ডলারের ওপরে। বিপিসি জানায়, লোকসান মূলত হয় ডিজেলে। এটা আমদানি করা হয় পরিশোধিত তেল হিসেবে, যার মূল্য আরও বেশি। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি পরিশোধিত ডিজেলের দাম ছিল ১৭৪ ডলার। প্রতিদিন যে পরিমাণ লোকসান হচ্ছে, তাতে বিপিসির কাছে আগামী অর্থবছরের তেল কেনার টাকা নেই বলে দাবি করছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।

শতকোটি টাকার বহুতল ভবন হচ্ছে :লোকসানের কথা বললেও প্রায় ১১ হাজার ৫১ কোটি টাকার ১১টি উন্নয়নমূলক প্রকল্প চলছে বিপিসির। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৩১৭ কোটি টাকায় তিনটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মিত হচ্ছে। ঢাকার শাহবাগে ৩৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা অয়েলের জন্য একটি ১২ তলা ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন।

মুনাফার টাকা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে :বাৎসরিক লভ্যাংশ থেকে গত সাত বছরে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে বিপিসি। এর বাইরে এককালীন হিসেবে গত দুই অর্থবছরেই ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। ট্যাক্স-ভ্যাটের অর্থ বাদে বিপিসির নিট মুনাফা থেকে এসব অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে গেছে। এর বাইরে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে আরও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে সরকারকে দিয়েছে বিপিসি।

হিসাবে স্বচ্ছতা নেই :কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিপিসির হিসাব ও অডিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো। বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপিসির অডিট করানোর জন্য আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিলেও তা কাজে আসেনি। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগ বিপিসিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও লাভ হয়নি। তিনি বলেন, বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এতে স্বচ্ছতা নেই। লাভ-লোকসানের অস্বচ্ছ হিসাব দেখিয়ে হুট করে ডিজেলের দাম বাড়িয়ে নিল বিপিসি। আইন অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করার কথা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। কিন্তু বিপিসি কখনোই কমিশনের আওতায় আসেনি। ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। হিসাবে স্বচ্ছতা নেই বলেই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সামনে শুনানিতে অংশ নিতে ভয় পায় বলে মন্তব্য করেন ক্যাবের এই উপদেষ্টা।

দাম সমন্বয়ের কথা বললেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীও :বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপিসি প্রতিদিন শতকোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। গ্রাহকরা চাপে পড়ূক, এটাও সরকার চায় না। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বুয়েটের শিক্ষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম সমকালকে বলেন, হুট করে তেলের দাম বাড়ানো ঠিক না। আরও একটু পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কারণ গত নভেম্বরে যখন দাম বাড়ায় তার ২০ দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে দাম পড়তে শুরু করে। তিনি বলেন, পাঁচ মাসে এক হাজার কোটি টাকা লোকসানের কথা বলে বিপিসি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। কিন্তু এর প্রভাবে জনজীবনে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যয় বেড়েছে। ২৩ শতাংশ দাম বাড়িয়ে পরিবহন ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। তাই জ্বালানি তেলের দাম ভেবেচিন্তে বাড়ানো উচিত।

দেশে প্রতিবছর জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। বাকি চাহিদা পরিশোধিত তেল আমদানি করে মেটানো হয়। সূএঃ সমকাল। সম্পাদনা না/রি। স ০৬১৫/০২

Related Articles